অর্ধশত বছর পর জেগে উঠেছে ভিটা, বাসিন্দারা ফিরছেন পূর্বপুরুষের জমিতে

মেঘনার মোহনায় ভাঙনে বিলীন হয়েছিল সন্দ্বীপের অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। অর্ধশতাব্দী পর সেই ভূমির বড় অংশ জেগে উঠেছে। সেখানে এখন আমন ধানের চাষ, মাছ ধরা ও পশুপালন চলছে। পূর্বপুরুষের জমি চিহ্নিত করে কেউ ঘর তুলছেন, কেউ জমি বর্গা দিচ্ছেন। তবে নতুন জেগে ওঠা এসব চরে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই।

সন্দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের নতুন জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ ভূমি স্থানীয়ভাবে সবুজচর নামে পরিচিত। এর পশ্চিমে রয়েছে আরও নতুন একটি চর। স্থানীয় মৎস্যজীবী ও রাখালেরা এর নাম দিয়েছেন—‘ডোবাচর’। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৩ কিলোমিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় চার কিলোমিটার বিস্তৃত এই চর জোয়ারে ডুবে গেলেও ভাটায় জেগে ওঠে।

সন্দ্বীপের বিলীন হয়ে যাওয়া হুদ্রাখালী, কাটগড়, বাটাজোড়া, রোহিনী ও ইজ্জতপুর ইউনিয়নের কিছু অংশজুড়ে ডোবাচরের বিস্তার। এর পশ্চিমে জাহাইজ্জারচর বা স্বর্ণদ্বীপ। সেখান থেকে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার।

৩ আগস্ট ডোবাচরে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে আমন ধানের খেত। ধান চাষ, মাছ ধরা ও পশুপালনকে কেন্দ্র করে সেখানে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। গত বছর হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এই চরে ফিরে বসতি গড়ে তুলেছিল। এ বছর অন্তত ১৫টি পরিবার ঘর তুলেছে। তবে এর বাইরেও কেউ একা এসে পূর্বপুরুষের জমি চিহ্নিত করে বর্গা দিয়েছেন, কেউ পরিবার নিয়ে বসতি গড়েছেন। কেউ আবার বাঁশ ও চট দিয়ে অস্থায়ী টংঘর বানিয়ে থাকছেন।

বসতি শুরু করা ব্যক্তিদের একজন ৫০ বছর বয়সী মো. নুর উদ্দিন। শৈশবেই ভিটেমাটি হারিয়ে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের মোহাম্মদপুরে চলে যান তিনি। ২০২৪ সালের মার্চে তিনি ডোবাচরে ঘর তোলেন। পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকছেন। তিনি বলেন, ‘আমার খতনাও হয়েছে মোহাম্মদপুরে। ৫০ বছর বয়সে বাপ-দাদা আর নিজের জন্মভিটায় ফিরে এলাম।’

৯৬ বছর বয়সী বশির উল্যাহ জীবনে ১১ বার ভিটে বদলেছেন। এখন থাকেন কালাপানীয়া ইউনিয়নের ছেঁড়া বেড়িবাঁধ এলাকায়। তাঁর জন্ম কাটগড় ইউনিয়নের চর রহিম মৌজায়। ডোবাচরের একটি জায়গা দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই যে আঁর (আমার) জন্মভিডা, শরীলে কুলাইলে চাষে নামি পইড়তাম।’

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বশিরের দুই ছেলে ভেসে যান। বয়সের কারণে এখন আর ডোবাচরে নামতে পারেন না তিনি। যদিও পুরোনো বাসিন্দাদের অনেকেই ফিরছেন পূর্বপুরুষের ভিটায়।

‘চর লায়েক হচ্ছে’

ডোবাচরের চরলক্ষ্মীর ঘাট এলাকায় এখন দুটি দোকান হয়েছে। চাষি, রাখাল ও মৎস্যজীবীদের আনাগোনা বাড়ায় গত বছর দোকান খোলেন আব্দুর রহমান (৬০)। সকাল সাতটা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত তাঁর দোকানে মানুষ থাকে। চা-নাশতার পাশাপাশি চাল, ডাল, তেল ও তরকারিও বিক্রি হয়।

জোয়ারের প্রথম ঢেউকে স্থানীয়ভাবে ‘শর’ বলা হয়। শর আসার আগে সরু জলভাগ পার হতে হয়। ভরা কাটালের জোয়ারে ডোবাচরের অনেক অংশ পানিতে ডুবে গেলেও ধানের আগা তখনো দেখা যায়। চাষি জামাল উদ্দিন (৫৪) বলেন, ডোবাচর এখন আর জোয়ারে পুরোপুরি ডুবে যায় না। ধীরে ধীরে ‘চর লায়েক হচ্ছে’। এর অর্থ দাঁড়ায়, এই সময়ই চর চাষাবাদের জন্য ভালো। ধানের ফলন ভালো হয়, মাছও বেশি পাওয়া যায়। গবাদিপশুর খাদ্যও মেলে। চাষিদের হিসাবে, এ বছর ডোবাচরে প্রায় পাঁচ হাজার কানি, অর্থাৎ সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে।

মাছ বিক্রিতে চলছে সংসার

মাছ বিক্রি করে ফিরছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন (৬০) ও মো. ইউসুফ (৫৫)। সাহাবুদ্দিন নোয়াখালীর কবিরহাট ও ইউসুফ উড়িরচরে ৫০ বছর ধরে বসবাস করছিলেন। পূর্বপুরুষের ভিটে জেগে ওঠার খবর পেয়ে তাঁরা পরিবার নিয়ে ডোবাচরে ফিরে এসেছেন।

সাহাবুদ্দিন ১৫ কানি এবং ইউসুফ ১৩ কানি জমিতে ধান চাষ করেছেন। আমন ধান উঠবে কার্তিকের শেষে। তার আগে সংসারের খরচ চলছে মাছ বিক্রির আয় দিয়ে। পাশাপাশি পরিবারের নারীরা হাঁস-মুরগি পালন শুরু করেছেন।

পশুর চারণভূমি

ডোবাচরে কয়েক বছর ধরে গরু, মহিষ ও ভেড়ার বাথান গড়ে উঠেছে। মো. বাহার (৫৫) জানান, চাষাবাদ বেড়ে যাওয়ায় তাঁর গরুর পাল এখন চরটির দক্ষিণের খালি অংশে রাখা হয়েছে। ধান কাটার পর আবার সেগুলো ফিরিয়ে আনা হবে।

নিজাম উদ্দিন (৬২) বলেন, চরটির দক্ষিণ প্রান্তের নিচু ভূমিতে হাজারো গরু-মহিষ চরে। জোয়ারের পানি বাড়লে গরু ও ভেড়াকে মাটির তৈরি উঁচু ‘কেল্লায়’ রাখা হয়। মহিষ অবশ্য পানিতে তেমন সমস্যায় পড়ে না।

এদিকে নতুন চরে জন্মানো উড়ি, গুল্ম ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে জমি চাষের উপযোগী করার কাজ চলছে। স্থানীয়ভাবে এ কাজকে বলা হয় ‘বাগান ভাঙা’। চরলক্ষ্মীর ঘাট থেকে উত্তরের দিকে গেলে ঝোপ পরিষ্কার করে তৈরি করা নতুন ধানের অনেক খেত দেখা যায়।

ঝুঁকির মধ্যেই বসতি

চরের উত্তর প্রান্তে সর্বশেষ ঘরটি উড়িরচর থেকে ফিরে আসা মোহাম্মদ মুনশির (৪৮)। তাঁর চারপাশে ধানের খেত, দূরে নুনাগাছের ঝোপ। ঘর থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে আর কোনো বসতি নেই।

ডোবাচরে বসতি গড়া মানুষের জীবিকা ও জীবনযাত্রার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনেকেই অবগত নন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের বসবাস।

১৯৭২ সালে ভিটে হারানো হেলাল উদ্দিন (৫৩) বলেন, ‘জীবনের সকল রং নিজের চোখে দেখে ফেলেছি। ঠিকানাহারা হইলে মানুষ আর কোনো বিপদেরে বিপদ মনে করে না। যে সাগর সবকিছু কেড়ে নিছে, সে সাগরই তো দুই হাত ভরি ফিরাই দিতেছে। তাই সাগরে ভরসা রাইখতে চাই।’

সন্দ্বীপের নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, ডোবাচরের অরক্ষিত এলাকায় মানুষ বসতি গড়েছে—এ বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তিনি বলেন, ঝুঁকির বিষয়টি বাসিন্দাদের বিবেচনায় রাখা উচিত। সরকারি উদ্যোগে ঝুঁকি কমানোর কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *