নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ধরা হচ্ছে ইলিশ, সরকারি সহায়তা পাননি কোনো জেলে

মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বটগাছতলা ও রহমতপুর ঘাটে ইলিশ ধরার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে আয় বন্ধ হয়ে অনেক জেলে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাঁদের কেউ আজ শুক্রবার পর্যন্ত সরকারি খাদ্যসহায়তা পাননি।

মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বিভিন্ন ঘাটে ইলিশ ধরা চলছে। উপজেলার উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে প্রতিদিন সাত থেকে আটটি নৌকা সাগরে গিয়ে ইলিশ ধরে ফিরছে। রাতের আঁধারেই এসব মাছ কেনাবেচা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ১৫ দিনেও তাঁদের কেউ সরকারি খাদ্যসহায়তা পাননি। এ কারণে বাড়তি টাকার আশায় অনেকেই সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ জেলেদের।

নিষেধাজ্ঞায় ইলিশ শিকার বন্ধে একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে মৎস্য বিভাগ। উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সন্দ্বীপের বিভিন্ন ঘাটে ৮ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২৩টি যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ২১টিতেই কাউকে আটক কিংবা ইলিশ উদ্ধার করা যায়নি। দুটি অভিযানে ৩০৫ কেজি ইলিশ ও ৪২ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। পরে দুই জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে।

সন্দ্বীপের মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মোতাছিম বিল্লাহ বলেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের ধরতে কীভাবে অভিযান সফল করা যায়, তা নিয়ে তাঁরা ভাবছেন। জেলেদের হাতেনাতে ধরতে কোস্টগার্ডের সহায়তায় সাগরে অভিযান চালানো অথবা লোকবল বাড়িয়ে একই এলাকার একাধিক স্থানে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

দক্ষিণে প্রস্তুতি, উত্তরে ধরা হচ্ছে ইলিশ

উপজেলার উত্তর এলাকায় নিষেধাজ্ঞা মেনে ইলিশ ধরা হলেও ব্যতিক্রম দেখা গেছে দক্ষিণের ঘাটে। সেখানে জেলেরা জাল বোনা, ছেঁড়া অংশ মেরামত ও মোটা রশি জোড়া দেওয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে তাঁরা সাগরে ফিরবেন বলে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

গত বুধবার দক্ষিণ সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বাংলাবাজার ও গাছতলী ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বেড়িবাঁধে বসে কয়েকজন জেলে জালের ছেঁড়া অংশ মেরামত করছেন। পশ্চিম মাইটভাঙ্গা বেড়িবাঁধ ধরে গাছতলীর দিকে যেতে আরও কয়েকটি জায়গায় একই দৃশ্য দেখা যায়। জেলেরা জানান, মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তাঁরা জাল মেরামত করে নিচ্ছেন।

জাল মেরামত করতে করতেই জেলে আবুল বাশার (৪৫) বলেন, ‘এখন সাগরে যাওয়া বন্ধ, তাই হাতে সময় আছে বলে জাল তুনে (মেরামত) রেডি হইতেছি। বন্ধ শেষ হলেই সাগরে যাব।’

আবুল বাশার জানান, বাংলাবাজার ও গাছতলী ঘাট থেকে এখন কোনো নৌকা সাগরে যাচ্ছে না। বেশির ভাগ নৌকার মাঝি ও জেলেরা ছুটিতে গেছেন। তাঁরা ২৯ অক্টোবর ফিরবেন। পরদিন ৩০ অক্টোবর আবার সাগরে যাবেন।

উপজেলার সদারহাটের একটি ফাঁকা জায়গায় মোটা সুতার জাল বুনছিলেন দুর্লভ জলদাস (৩৫) । তিনি একটি নৌকার মালিক। তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে তাঁর নৌকাটি নতুন জাল নিয়ে সাগরে যাবে। তিনি যে জাল বুনছেন, এটি বড় সামুদ্রিক মাছ ধরতে ব্যবহার হয়।

দক্ষিণ সন্দ্বীপের প্রধান দুই ঘাটে যখন নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে ফেরার প্রস্তুতি চলছে, তখন উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে রাতের আঁধারে ইলিশ কেনাবেচার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সন্দ্বীপের মধ্যভাগের রহমতপুর ঘাট থেকেও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ ধরার খবর পাওয়া গেছে।

সন্দ্বীপ মৎস্য অফিসের মাঠ সহকারী মাহমুদুন নবী জানান, বুধবার রহমতপুর ঘাট থেকে অবৈধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দিয়েছে মৎস্য বিভাগ। এর আগে ১৫ অক্টোবর ওই ঘাটে ইলিশসহ হাতেনাতে ধরা পড়া দুই জেলেকে আর্থিক জরিমানা করা হয়।

মাহমুদুন নবী বলেন, ১৪ অক্টোবর রাতে উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে অভিযান চালিয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের ধরার চেষ্টা করেন তাঁরা। রাতভর ঘাটের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে ভোরের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ভোর হওয়ার পরও ঘাটে কাউকে দেখতে পাননি। পরে জানতে পারেন, আশপাশের অন্য স্থানে ইলিশ কেনাবেচা হয়েছে। তাঁরা সন্দ্বীপের উত্তর এলাকায় মাছ ধরা বন্ধের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে জানান, জোয়ারের ওপর নির্ভর করে রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরেন জেলেরা। একেক দিন একেক জায়গায় মাছের হাতবদল হয়। অন্য সময়ের তুলনায় এসব মাছের দামও কম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে বলেন, সূক্ষ্ম ফাঁসের কারেন্ট জালে ছোট আকারের ইলিশ, এমনকি জাটকাও ধরা পড়ছে। আবার এক কেজি ওজনের ইলিশও পাওয়া যাচ্ছে। ধরা পড়া কিছু ইলিশের দৈর্ঘ্য ছয় থেকে আট ইঞ্চি। এগুলো জাটকা মাছ। সাধারণ সময়ে উন্মুক্ত ‘ডাক’ পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে ইলিশ বিক্রি করা হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নির্ধারিত কিছু ব্যবসায়ী গোপনে মাছ কিনে নিচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *